Home | মতামত | ‘সেই দিনগুলো ড. কামাল হোসেন বেমালুম ভুলে গেছেন’

‘সেই দিনগুলো ড. কামাল হোসেন বেমালুম ভুলে গেছেন’

সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা, ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধসংগ্রামী আমার প্রিয় শাহ আজিজুর রহমান ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ তাকে বেহেশতবাসী করুন।

কোনো লেখা কারও স্বার্থে গেলে মানুষ যে কতটা সাড়া দিতে পারে অথবা বিপক্ষে গেলে বিক্ষুব্ধ হয় গত পর্বের বিদ্যুৎ নিয়ে লেখায় নতুন করে বুঝতে পারলাম। আসলেই বিদ্যুতের কারচুপিতে মানুষ দিশাহারা, বড় কষ্টে। মিটার রিডাররা বছরেই কোটিপতি, গ্রামের হতদরিদ্র মানুষ রাস্তার ফকির। কতজন কত সময় ছুটে আসে ‘আমার দুইটা বাত্তি, একটা ফ্যান। প্রথম প্রথম বিল আসত ৩০০-৪০০ টাকা। সেদিন এসেছে ২০০০ টাকা।’ কোনো জবাব নেই। সখীপুরে আমার প্রিয় আবু নঈম মোহাম্মদ একজন সেরা মুক্তিযোদ্ধা। ’৭১-এ যুদ্ধে তার নিরলস ভূমিকা আছে। বঙ্গবন্ধু যেদিন কাদেরিয়া বাহিনীর হাত থেকে অস্ত্র নিতে সড়কপথে টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন সেদিন টাঙ্গাইলের প্রান্তসীমা গোড়াই ক্যাডেট কলেজের পাশে তার ডিউটি ছিল। কে বা কারা ছবি তুলেছিল সে ছবি দেখে আমার বার বার মনে হতো এ যেন চে গুয়েভারা দাঁড়িয়ে আছে। সেই আবু নঈম মোহাম্মদের ছোট্ট একটা মুরগির খামার। তাতে একটা পানির পাম্প, ১০-১২টা ছোট বাল্ব, দুই বা তিনটা ফ্যান- বিল করে বসে আছে ৩ লাখ ৬০-৬৫ হাজার টাকা। শুধু বিল নয়, তার নামে ওয়ারেন্টও হয়েছে। কারণ বিদ্যুতের জন্য ওয়ারেন্ট ইস্যু করা খুবই সোজা।
আমরা লাচার, এখন কীই-বা করি? অন্যের যন্ত্রণা তো আছেই, নিজের যন্ত্রণায় পেরেশান হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম।

কী হবে জানি না তবু সান্ত্বনা যে, প্রতিকারের আশায় তার দৃষ্টিতে এনেছি। লেখাটিতে কী আছে এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। কিন্তু চিঠিপত্র-টেলিফোন, ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে শুভেচ্ছা জানানো এবং বিদ্যুতের নির্বাহীদের বিলের ধরন-ধারণ নিয়ে ইতিমধ্যে বহু মানুষ কথা বলেছেন। আমার সামান্য কথা যদি কারও একবিন্দু কাজে লাগে তাতে আনন্দে বুক ভরে যায়। ’৯০-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছি। তার আগে ভারতে ছিলাম প্রায় দেড় যুগ। ভারত সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাননীয় মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বা দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গকে যখনই চিঠি দিয়েছি সেটা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, অটল বিহারি বাজপেয়ি, শ্রীজ্যোতি বসু, সর্বোদয় নেতা শ্রীজয়প্রকাশ নারায়ণ, রাজীব গান্ধী, নরসীমা রাও, বিজু পট্টনায়েক, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, এ বি এ গণি খান চৌধুরী, সাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রীপ্রণব মুখার্জি এমনকি লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রবোধ কুমার সান্যাল, তারাশঙ্কর, অন্নদাশঙ্কর রায়, মনোজ বোস, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অভীক সেন, অমিতাব চৌধুরী ও অমিতাভ চৌধুরী, বরুণ সেন, সুখরঞ্জন দাস, হিরণ¥য় কার্লেকর কার কথা বলব, হাজার জনের নাম দিতে পারি। যাকে যখন পত্র দিয়েছি সেটা যে বিষয়েই হোক উত্তর পেয়েছি। ’৭৫-এর প্রতিরোধসংগ্রামী বিশ্বজিৎ নন্দীকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ফাঁসি দিতে গেলে পৃথিবীর এমন কোনো রাষ্ট্রনায়ক নেই যার কাছে নন্দীর জীবন রক্ষায় আবেদন জানাইনি।

সেখানে রাশিয়ার ব্রেজনেভ থেকে শুরু করে মিসরের হোসনি মোবারক, ইয়াসির আরাফাত, ব্রিটেনের আয়রন লেডি থেচার আরও কতজন যে ছিলেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের চমৎকার হাতে লেখা অন্য কারও হাতে ইংরেজি করে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী, প্রণব মুখার্জি, জ্যোতি বসু কেউ উত্তর দিতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু ’৯০-এ দেশে ফিরে যখন যাকেই চিঠি দিয়েছি দু-এক জন ছাড়া কেউ উত্তর দেননি, একদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জনাব মাহবুবুল আলমকে ফোন করেছিলাম। মনে হয় সকাল ৮টা-সাড়ে ৮টা হবে। তিনি তখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। কয়েকবার রিং হলেও ধরতে পারেননি। সাড়ে ৮টার দিকে তিনি নিজে ফোন করেছিলেন। ফোন ধরতেই বলেছিলেন, ‘কাদের ভাই আপনি ফোন করেছিলেন। ধরতে পারিনি।

আমি খুবই লজ্জিত।’ বলেছিলাম, মাননীয় উপদেষ্টা, অবাক হলাম আপনার ফিরতি ফোন পেয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘ভদ্রসমাজে ফিরতি ফোন করা একটা নৈতিক দায়িত্ব। ’৭২-এ বঙ্গবন্ধু যেদিন আপনার কাছ থেকে অস্ত্র আনতে গিয়েছিলেন সামান্য সাংবাদিক হিসেবে সেই অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। কাদের সিদ্দিকী আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর পর হিমালয়ের মতো।’ তার কথা খারাপ লাগেনি। তার কথায় অহংকারে ফুলে যাইনি। কিন্তু ভালো লেগেছিল। বিদ্যুতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সেদিন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের এমডির কাছে আবেদন নিয়ে গিয়েছিলাম। তারা বিষয়টি বিবেচনার জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি করে এ মাসের ১২ তারিখ আমায় চিঠি পাঠিয়েছেন। মনে হয় জনস্বার্থে চিঠিটাই তুলে দেওয়া দরকার। তাই দিলাম।
‘জনাব বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম, ২০/৩০, বাবর রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
বিষয় : বিদ্যুৎ বিল পরীক্ষাপূর্বক মতামত/সুপারিশমালা দাখিলের জন্য কমিটি গঠন।
সূত্র : ৬১২,৩০/০৮/২০১৮ ইং, আপনার পত্র।

বিদ্যুৎ বিল সংশোধনের জন্য অত্র দপ্তরে গৃহীত আপনার আবেদনখানা পরীক্ষাপূর্বক সুনির্দিষ্ট মতামত/সুপারিশমালাসহ প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য ৫ (পাঁচ) সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের আলোকে পরবর্তীতে বিল সংশোধনের জন্য যথাশীঘ্র ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে আপনার সদয় সহযোগিতা কামনা করছি।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়ের নির্দেশক্রমে, মো. মুজিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সিসিও টু এমডি, ডিপিডিসি।’

সবার ক্ষেত্রে এমন যদি হতো তাহলে কতই না ভালো হতো। আমি শুধু অপেক্ষায় আছি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কম্পিউটারে রাখা ২০১৭ সালের মার্চে ১৮০৭ ইউনিট, এপ্রিলে ৩৩৯ ইউনিট, মে-তে ২৮৮৯ ইউনিট; অন্যদিকে ২০১৬ সালে সেপ্টেম্বরে ৪০০ ইউনিট, অক্টোবরে ৪১০৩ ইউনিট- এ রকম অসংখ্য অসামঞ্জস্য বিল কী করে হয় দেখার অপেক্ষায় আছি। সমাধান গ্রহণযোগ্য হলে এবং তা সবার জন্য হলে সব থেকে খুশি হব। অন্যদের আস্থা না থাকলেও দেশের আইন-আদালতের প্রতি এখনো আমার আস্থা আছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে অনেক কোর্ট-কাচারি আদালত আমাকে একজন সামান্য নাগরিকের মর্যাদাও দেয়নি। অগ্রণী ব্যাংকের সোনার বাংলা প্রকৌশলী সংস্থা (প্রা.) লিমিটেডের কাছে প্রকৃত পাওনা ১৯ লাখ। আমাদের পরিশোধ করা টাকা আমাদের দিয়ে একটা মনগড়া হিসাব বানিয়ে ৮-১০ বছরে মঞ্জুরি দিয়েছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আমরা সে সময় ব্যাংককে দিয়েছিলাম ৬ কোটি ৭৭ লাখ।

একসময় ব্যাংককে বলেছিলাম, আপনারা আমাদের কত টাকা দিয়েছেন আর আমরা আপনাদের কত দিয়েছি এ দুটোর একটা হিসাব হয়ে যাক। তাতেই অমন দৃশ্যপট বেরিয়ে আসে। আমরা কোনো দিন এক পয়সা সুদ মওকুফ নিইনি। তার পরও ব্যাংক মনে হয় শক্তিমানদের প্রভাবে আমাদের সঙ্গে জালিয়াতি করেছে। তবে এটা সত্য, কোনো শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যাংক আমাদের সঙ্গে কখনো কোনো খারাপ আচরণ করেনি। ৪২৭ নম্বর অগ্রণী ব্যাংক বোর্ডের এক প্রস্তাবে আমাদের নামে ১০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ঋণ দেখিয়ে ১০ বছরের সুবিধা দিয়েছে। সেইভাবে তারা আমাদের চিঠিও দেয়। আমরা সেভাবেই এগোতে থাকি। হঠাৎই ভূতে ধরেছিল কিনা জানি না, বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী পদত্যাগ করায় যে মাটিতে আমার নাড়ি পোঁতা সেই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলাম। সে অনেক কথা। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ ছিল ১১ তারিখ। মনে হয় অক্টোবর মাস। যাচাই-বাছাই ছিল ১৩ তারিখ। যাচাই-বাছাইয়ের সময় ১২ তারিখের এক পত্র নিয়ে অগ্রণী ব্যাংক রিটার্নিং অফিসারের কাছে হাজির হয়। সেখানে লেখা, ‘সোনার বাংলা প্রকৌশলী সংস্থা (প্রা.) লিমিটেডের সব সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকবে। তবে ঋণটি মন্দ ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। মানে সুবিধার মধ্যে সোনার বাংলা প্রকৌশলী সংস্থা (প্রা.) লি. ঋণ পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত অন্য কোনো আর্থিক লেনদেন করতে পারবে না।’

কোম্পানির পরিচালকরা রাজনীতিতে থাকলে তারা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। আমার মতো মানুষেরও নির্বাচনে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা বলে আমি এত বেকুব যে, এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। কালিহাতীর মনোনয়ন ইলেকশন কমিশন বাতিল করায় হাই কোর্ট বৈধ করে মার্কা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। মার্কা বরাদ্দের পর নির্বাচনসংক্রান্ত যে কোনো জিনিস অচল। নির্বাচনী আইনে নির্বাচনের আগে আর কোনো আইনি কর্মকা- চলে না। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল খুব ক্ষুব্ধ হয়ে প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে পরে নির্বাচন কমিশনের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রায় এক বছর ঘুরিয়ে মনোনয়ন বৈধ-অবৈধ ব্যাংকের কার্যক্রম ঠিক-বেঠিক সেদিকে না গিয়ে ‘রিটটি মেইনটেইনেবল নয়’ এ কথা বলে খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রিয়জনদের ৫ হাজার ৪৫৩ কোটি বিনা সুদে ২৫ বছরের জন্য ব্লকড, আরও কত কী। কতজন কত হাজার হাজার কোটি ভাগবাঁটোয়ারা করে খাচ্ছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের একটা নির্মাণপ্রতিষ্ঠান সোনার বাংলা প্রকৌশলী সংস্থা (প্রা.) লি. প্রকৃত ১৯ লাখ টাকা ১০ কোটি ৮৮ লাখে উন্নীত করে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই হচ্ছে বর্তমানে আইন-কানুন বিধি-বিধান। বর্তমানে দেশে সব থেকে আলোচিত বিষয় অর্থবহ জাতীয় ঐক্য এবং অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন। মানুষ এখন আর অন্য কিছু শুনতে চায় না।

সেদিন জাতীয় ঐক্যের এক ডাক এসেছে গণফোরাম বা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ে। অনেক কথা হচ্ছে এই জাতীয় ঐক্যের সূচনা নিয়ে। শহীদ মিনারে ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। ঐক্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শহীদ মিনারে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষের জানার যতটা সুযোগ আছে তাতে কথাটা সত্য নয় বলেই মনে হয়। তা যাই হোক, আমরাও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের জন্মের ঘোষণা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সন্ত্রাসীদের আক্রমণে দিতে পারিনি।

জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে দিয়েছিলাম। সেই দল আজ পা পা করে ১৯ বছর পার করছে। ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ ২০-এ পা দেবে। সত্যিকার অর্থে জাতির তীব্র আকাক্সক্ষা, দুই বলয়ের বাইরে নির্ভরযোগ্য অর্থবহ একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠুক। ড. কামাল হোসেন প্রায় ১৫ বছর আগে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। আমাদের দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ তাতে সাড়া দিয়েছিলাম। শেষ পর্যায়ে যেদিন সভাটি হয় সেদিন বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিকল্পধারাও অংশ নিয়েছিল। আমরা রাত-দিন পরিশ্রম করেছিলাম। গামছা নিয়ে প্রায় ১০-১৫ হাজার নেতা-কর্মী এসেছিল। অন্যদিকে প্রশিকার ২-৩ হাজার কর্মীকে প্যাকেটে খাবার ও চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়েছিল। যা ছিল রাজনৈতিক কর্মকা-ের জন্য বিসদৃশ। সেই দিনগুলো ড. কামাল হোসেন বেমালুম ভুলে গেছেন। আলাপের সময় কখনো সেগুলো উঠে আসে না। এখন ওঠে ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৮ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসা তার চোখে সব থেকে বড় অ্যাচিভমেন্ট। কিন্তু সাধারণ মানুষ ২০০৮ সালের নির্বাচনকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। তার পরও প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কখনো মাহমুদুর রহমান মান্নাকে একেবারে ছায়ার মতো করে, কখনো বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে একসঙ্গে বিবৃতি দিয়ে একটা জাতীয় সমঝোতা বা জাতীয় আশাবাদ সৃষ্টির চেষ্টা সব সময় ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী করে এসেছেন। সুতোর টান কতটা শক্ত বলতে পারব না। তবে এখনো তারা তা করছেন। কথা লম্বা হয়ে যায়, তাই ছোট করে বলছি।

গত বছর ৪ ডিসেম্বর আ স ম আবদুর রবের বাড়িতে যুক্তফ্রন্টের নাম ঘোষণা করা হয়। ড. কামাল হোসেন দেশের বাইরে ছিলেন বলে আমি বলেছিলাম, ঘোষণাটা একত্রে হলে ভালো হতো। আমি দুই প্রবীণ নেতার একত্র চলার আন্তরিক চেষ্টা করেছি। যে কারণে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর যুক্তফ্রন্টে আছি, কি নেই এ কথা বলার কারও সুযোগ ছিল না। নিষ্ক্রিয় ছিলাম বা আছি এটাই বাস্তব। কদিন আগে স্নেহের মাহী বি. চৌধুরী কী প্রসঙ্গে যেন বলেছিল, ‘কাদের সিদ্দিকী যুক্তফ্রন্টের কেউ নন।’ মেনে নিলাম অল্প বয়সী ছোট মানুষ সে বলতেই পারে। সেদিন মাহমুদুর রহমান মান্নাও একই রকম বলেছেন। তার কথাটা ঠিক হয়েছে কিনা বিচার-বিশ্লেøষণের প্রয়োজন আছে। সত্যিই আমি একটু অন্য ধরনের মানুষ। বিদ্যা নেই, বুদ্ধি নেই শুধু আকাশ-বাতাস রাস্তাঘাট উদাম গায়ের মানুষদের দেখে যতটা শেখা যায় সেই শিক্ষা নিয়ে পথ চলি। যুক্তফ্রন্ট গঠনের আগেও আ স ম আবদুর রবের বাড়িতে এক বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই বৈঠকখানায় পুলিশ গিয়ে বলেছিল, সভা তাড়াতাড়ি শেষ করুন। পুলিশ প্রশাসনের বেয়াদবির প্রতিবাদে চলে এসেছিলাম। আমার চলে আসা অনেক নেতারই পছন্দ বা ভালো লাগেনি। আমি একজন নগণ্য মানুষ। জীবনের জন্য ইজ্জত নয়, বরং ইজ্জতের জন্য জীবন দিতে পারি। গঙ্গা-যমুনা-পদ্মার পানি অনেক গড়িয়েছে। কদিন আগে (অব.) মেজর মান্নানের বাড়িতে তারপর ড. কামাল হোসেনের বাড়িতে জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টায় নিয়োজিত নেতাদের আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এই সেদিন তানিয়া ভাবি ও আ স ম আবদুর রবের আহ্বানে ডালভাত খেতে ড. কামাল হোসেন তার কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে উত্তরা গিয়েছিলেন। সেখানে সবাই মিলে আলাপ-আলোচনা করে সেদিন জাতীয় ঐক্যের শুভ সূচনা করেছেন। আমি এ ঐক্যকে অভিনন্দন জানাই।

অন্তরের সমস্ত শুভ কামনা দিয়ে তাদের সফলতা কামনা করি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলি, এই পরিসরে এ ধরনের প্রচেষ্টায় ক্যামেরা বা পত্রিকার সামনে প্রেস ক্লাবে যত উচ্চবাচ্য করা হোক তা দেশ ও জাতির মননে কোনো নাড়া লাগবে না। আ স ম আবদুর রবের বাড়িতে বৈঠকের আগে ড. কামাল হোসেন আমাকে ফোন করেছিলেন। যার বাড়িতে দাওয়াত তিনি করেননি। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী মিলিটারি একাডেমিতে পায়ে পা মিলিয়ে চলার মতো চললে বিনা শর্তে তাদের পেছনে আছি এটা আমি সবকিছু হাজির নাজির জেনে শপথ করে বলতে পারি। কিন্তু কখনো ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে, কখনো ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আহ্বানে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করা আমার বা আমার দলের ইচ্ছা নয়। গত বর্ধিত সভায় আমরা আমাদের দলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছি, অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কে তাতে এলো বা এলো না তা আমাদের বিবেচ্য নয়, আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০-৩০ দিনের জন্য আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলনে অংশ নিতে চাই না। আমরা সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা প্রয়োজন সে আন্দোলনে অংশ নিতে চাই। কিন্তু কেন যেন আমাদের প্রবীণ নেতা যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ডা. বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছেন, ‘উনি তো নির্বাচনে নেমেই পড়েছেন।’ ¯েœহ করে আমার নামটাও নেননি, ‘উনি’ বলে ইঙ্গিত করেছেন। রক্তমাংসের মানুষ তো, কমবেশি আমাদেরও কষ্ট লাগে। কতজনকে বুকে আগলে রাজনীতি করেছি, কতজন ল্যাং মেরে চলে গেছে।

কিন্তু এখনো যে ২-৪-১০ জন দলের জন্য আমার জন্য জীবনপাত করে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা পায়ে দলি কী করে? আমার এবং আমার দলের উদ্দেশ্য একটি অর্থবহ জাতীয় ঐক্য। তার জন্য যতক্ষণ চেষ্টা করা সম্ভব আমরা করব। নির্বাচনে সিট ভাগাভাগির জন্য নামকাওয়াস্তে জাতীয় ঐক্যে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। বিএনপির কাছ থেকে সিট নিতে হলে কেন আমি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের সহযোগিতা নেব বা তাদের ভায়া হয়ে যাব? সরাসরি কানেকশন তো কম নয়। আওয়ামী লীগ থেকে সিটের ভাগ নিতে হলে আমার তো কোনো নাটক করার প্রয়োজন নেই। যারা ওসবের মালিক-মোক্তার তাদের সঙ্গে আমার সুতার নয়, রক্তের বন্ধন।

বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। এক অথর্বের হাতে তিন হাজার সৈন্য দিয়ে পিতাকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পিতার মৃত্যুর দিন তার ফোন পেয়ে ব্যক্তিগত অস্ত্র রিভলবার ছাড়া ছুটে এসে নিহত হয়ে জাতীয় বীর সেজেছেন। কর্তব্য অবহেলার জন্য শাস্তি পাননি। পিতার হত্যার প্রতিরোধে জীবন-যৌবন, পরিবার-পরিজনকে ধ্বংস করে শুধু নিন্দাই পেয়েছি। জাতি ও দেশের কল্যাণে কোরবান হতেও রাজি। কিন্তু শুধু জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উলঙ্গভাবে আমাকে কখনো পাওয়া যাবে না। তার জানমাল, সম্মান ব্যাহত হতে দেখলে- বিরোধিতা না করে কখনো সহযোগিতা করব না। ছেলেবেলায় বাঁধনছেঁড়া ঘরহারা রিকশা চালানো মানুষ আমি আল্লাহর দয়ায় এতদূর এসেছি। ষড়যন্ত্রের কালিমা কপালে মেখে এপার থেকে ওপার যেন আল্লাহ আমাকে না নেন। আল্লাহর কাছে মুসলমানের যেমন প্রার্থনা থাকে, হে আল্লাহ, তুমি আমাকে প্রকৃত মুসলমান না বানিয়ে মৃত্যু দিও না। ঠিক তেমনি আমার প্রার্থনা, মৃত্যুর আগে আমার গায়ে যেন ষড়যন্ত্রের দাগ না লাগে। ড. কামাল হোসেন কয়েকবার ফোন করেছিলেন। পিতার মতো মানুষ, তাই গতকাল গিয়েছিলাম। পরের পর্বে লিখব। সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন ।
লেখক : রাজনীতিক

About admin

Check Also

‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে’

গণফোরাম গঠনের সময় আমি ভোরের কাগজের রিপোর্টার। সৈয়দ বোরহান কবীর আর আমি ড. কামাল হোসেনের মতিঝিল অফিসে গেলাম। এরপর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের অফিসে। ব্যারিস্টার আমীর তখন মতিঝিলে বসেন। শুরুটাতে উত্তাপ ছিল। কারণ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, পংকজ ভট্টাচার্য, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকসহ ডান-বামের বিশাল রাজনৈতিক একটি গ্রুপ ছিলেন কামাল হোসেনের সঙ্গে। সেই সময় দেশজুড়ে তোলপাড়। সবার ধারণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *