Home | মতামত | আওয়ামিলীগের সেই দুঃসময়ে

আওয়ামিলীগের সেই দুঃসময়ে

কদিন থেকে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ রিপির ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ বইটি পড়ছি। পর্যাপ্ত সময় থাকলে এ কদিনেই পড়া হয়ে যেত। রিপির লেখা আমেরিকার অনেক শিশু আগ্রহ করে পড়ে। তার বইয়ের কাটতি অনেক। ভীষণ উচ্চ শিক্ষিত মানুষের লেখা ভালো না হয়ে পারে না। লেখাতে মুনশিয়ানা আছে, আছে অনেক তথ্য-উপাত্ত যা গবেষকদের কাজে লাগবে। বইটি শেষ না করে মন্তব্য করতে চাই না। তবে নানা পত্র-পত্রিকায় যা দেখছি তাতে বিচলিত না হয়ে পারিনি। মহান নেতা তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় অবদানের দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর পরেই তার স্থান। কিন্তু তারপরও কিছু কথা থেকেই যায়। আওয়ামী লীগের কিছু লোক যেমন বলতে শুরু করেছে ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ জামায়াতের অর্থে ছাপা হয়েছে। রিপির স্বামী ব্রাদারহুডের সদস্য।

এসব নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই। তবে বঙ্গবন্ধুর খুনি ডালিমের ভাই সম্পর্কের মনিরুল ইসলামের সঙ্গে তার প্রথম বিয়ে হয়েছিল- কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়। নিজের বাবাকে সবাই বড় করে দেখে কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে অত ছোট করার চেষ্টা করলে কথা তো কিছু হবেই। একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর ছেলে মাহাদী হাসানের ‘স্বাধীনতা তোমাকে ভালোবেসে জ্বলছি’ ৫০-৫৫ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটি উপন্যাস পড়ে অভিভূত হয়েছি। ছোট্ট একটি ছেলে কী অসাধারণ লেখা লিখেছে। লেখায় কোনো অশ্লীলতা নেই কিন্তু দুনিয়ার সব কুকর্মের কথা অবলীলায় বয়ান করেছে। বইটি সবার পড়া উচিত। পড়লে গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনেক কিছু জানা হবে। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সম্পর্কে কিছু লেখা আছে বলে বেশি লিখতে ইচ্ছা করছে না। তবে মাহাদী হাসানের ‘স্বাধীনতা তোমাকে ভালোবেসে জ্বলছি’ বইটি অসাধারণ। ছোট একটি বাচ্চা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমা পেরোয়নি সে-ই যদি অত চমৎকার লিখতে পারে, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীনের কন্যা রিপি তো কত অভিজ্ঞ। সে ইচ্ছা করলে ভালো-মন্দ কত কিছুই লিখতে পারে। গত ৩০ এপ্রিল আমার এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি নাসিম ওসমান মারা যায়।

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তার নামাজে জানাজা হয় ২ মে বেলা ১১টায়। রাষ্ট্রপতির পক্ষে এক জয়েন সেক্রেটারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। আওয়ামী লীগে যে কোনো মানবতা, উদারতা ও ভদ্রতা নেই তা সেদিনও দেখেছি। জানাজা শেষে মরণোত্তর গার্ড অব অনার মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা, উপনেতা, হুইপদের শেষে ঢাকার ডিসির পক্ষে ফুলের স্তবক দিতে আহ্বান করা হলো। কিন্তু কৃষক শ্রমিক জনতা লীগও যে একটি নিবন্ধিত দল, বেটে খাটো কে এক ভদ্রলোক ঘোষণা করছিল, সে আমাদের ধর্তব্যের মধ্যেই নিল না। জানাজার আগে মুরদা সম্পর্কে দুই কথা বলতে আহ্বান করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের জনাব তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় পার্টির হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ আমি কিছু বলব কিনা জানতে চেয়েছিলেন। সম্মতি দেওয়ার পরও বলতে দেওয়া হয়নি। জানি আওয়ামী লীগ ভোটে কারচুপি করে। কিন্তু লাশও যে ছিনতাই করে তাও দেখলাম। আজকাল আওয়ামী লীগের নাকি সুদিন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হলে যখন দুর্দিন ছিল তখন এই নাসিম বাসরঘরে বউ রেখে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংগ্রামে আমার সঙ্গে শরিক হয়েছিল- কথাটি শামীম ছাড়া কেউ বলেনি। ১৪ আগস্ট ছিল নাসিমের বিয়ে। শেখ কামাল আর নাসিম ছিল হরিহর আত্দা। তাই সে গভীর রাত পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ছিল। বন্ধুরা তাকে থেকে যেতে বলেছিল।

কিন্তু পরদিন শুক্রবার বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন সে জন্য মধ্যরাতে ধানমন্ডি ফিরেছিল। পরম স্রষ্টা আলেমুল গায়েবই জানেন পিতা-মাতা, স্ত্রী, ভাই-ভাবীদের সঙ্গে মৃত্যু তাকে টেনে এনেছিল কিনা। কিন্তু নাসিম প্রতিবাদ করেছিল। ওই সময় কি কষ্ট যে করেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। ২ মে নাসিমের কবর তার বাবার পাশে হয়েছে। ৪ মে হরতাল এবং প্রতিবাদ সভায় নারায়ণগঞ্জে গিয়েছিলাম। অপহরণের বিভীষিকায় নারায়ণগঞ্জ জ্বলছে, পুড়ছে, ছাই হচ্ছে। সরকার এখনই চোখ না খুললে সে-ও জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। চারদিকে গুম, খুন, অপহরণ, তারপরও বোধশক্তি বিবর্জিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলছেন, খুব বেশি কিছু হয়নি। আর কত হলে বেশি হবে ২-৪-১০ হাজার নাকি ২-৪-১০ লাখ বুঝতে পারছি না। নারায়ণগঞ্জের মানুষের ধারণা, প্রশাসন মানুষের পাহারাদার নয়, খুনি-লুটেরা-অপহরণকারীদের শরিক। নূর হোসেন নামে এক তস্কর এক সময় কারখানার গাড়ির হেলপার এখন আওয়ামী লীগকে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার ধন-সম্পদের মালিক। প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামকে সে দিবালোকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। সেই নজরুল অপহৃত হয়ে মারা যাওয়ার সাত দিন পর নূর হোসেনের বাড়ি কেন তল্লাশি হলো? সাত দিন পরও তার বাড়িতে রক্তমাখা গাড়ি পাওয়া গেল। এমনিতেই অপরাধী আলামত রাখতে চায় না। সাত দিন পরও যদি বাড়ির গ্যারেজে রক্তমাখা গাড়ি পাওয়া যায় তাহলে বুঝতেই হবে ডালমে কুচ কালা হ্যায়।

সেদিন এক পত্রিকায় প্রয়াত নাসিম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সেই সময়ের একটা ছবি দিয়েছিলাম। গত পরশু বাবুল হক বাঘের মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এসেই কৈফিয়ত তলব- স্যার, চিরাচরিত রীতি পত্রিকায় ছবি ছাপা হলে ফটোগ্রাফারের নাম থাকে, কেন আমার নাম থাকল না? অভিযোগ মিথ্যা নয়। কোনো জবাব দিতে পারিনি। জীবনের অনেক কঠিন সময়ে সে আমার সঙ্গে ছিল। ‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বাবুল ছবি তুলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমজাদ খানের ছেলে আশরাফুজ্জামান খান রতন, বাবুল হক আর বাবুল তালুকদার ছবি তুলত। সেগুলো উপসচিব বজলুর রহমান কুতুব টাঙ্গাইলের জি সাহার ছেলে মন্টু সাহার বাড়িতে ডেভেলপ করত। কাজটি ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তা তারা সাফল্যের সঙ্গে করেছে। পত্রিকায় ছাপা ছবিটি ছিল এক সময়ের নেতাজী সুভাষ বোসের ব্যক্তিগত সচিব ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা শ্রী সমর গুহ এমপি, শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণ, সাভারের মাহাবুব, প্রয়াত নাসিম ওসমান ও আমার। সময় পার হলে অনেক কিছুর গুরুত্ব থাকে না। ‘৭৭ সালে পাটনার ‘কদমকুয়ায়’ ভারতের নেতার নেতা শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণকে আমাদের সমস্যা বুঝাতে না পারলে কেউ নিরাপদ থাকতে পারতাম না, এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী বোন হাসিনাও না।

কারণ আমরা ছিলাম মহীয়সী নারী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থনপুষ্ট। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে পরাজিত করে জনতা পার্টি শাসন ক্ষমতায়। ইন্দিরা গান্ধীর সবচেয়ে বড় বিদ্বেষী শ্রী মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী। পারলে আমাদের কবর দেন। সেই সময় গিয়েছিলাম জয় প্রকাশজীর কাছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন আকাশে বাতাসে অন্তরীক্ষে ছিল বঙ্গবন্ধু, ঠিক তেমনি ভারতে তখন সর্বদয় নেতা শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণ। তার কথায় লক্ষ মানুষ একত্রিত হতো। তিনিই নানা মত ও পথের মানুষ একত্র করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে সরাতে জনতা পার্টির জন্ম দিয়েছিলেন। সুরেন্দ্র মোহন, মধু লিমাই, অশোক দণ্ডপাত, শ্রী চন্দ্র শেখর ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণের ভাবশিষ্য। সেই জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে ছবি তুলেছিল বাবুল হক। ছবির ক্যাপশনে তার নাম না থাকায় খুবই উত্তেজিত হয়েছিল। আমিও ভেবে দেখেছি ব্যাপারটা ঠিক হয়নি। বড় অন্যায় হয়ে গেছে। তাই ক্যাপশনে ওর নাম দিলাম। আমার হাতে দুবার মিসফায়ার হয়েছে। একবার মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্ধির শের আলীর বাড়িতে, অন্যবার ‘৭৫ সালের শেষদিকে গোবরাকুড়ার প্রবোধ দিওদের বাড়িতে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মিসফায়ারে ঘরের চাল ছিদ্র হলেও কেউ হতাহত হয়নি। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ। আমরা প্রথম ভারতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলাম।

ড. নুরুন্নবী, শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম, বাছেত সিদ্দিকী এমপি ও সরিষাবাড়ীর লুৎফরকে। তারা ১০-১২ দিন পর লতিফ ভাই আর জিয়াউর রহমানের চিঠিসহ শ’দুই রাশিয়ান এসএমজি, কিছু মার্কফো রাইফেল, কয়েকটা এলএমজি ও হাজারখানেক S.L.R নিয়ে এসেছিল। সঙ্গে এনেছিল বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক যা আমাদের যুদ্ধের গতি শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। হানাদারদের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই বিস্ফোরকের বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে। সেদিন রাশিয়ান এসএমজি পরখ করতে গিয়ে ঝাকি লেগে মিসফায়ার হয়েছিল। ঠিক একই রকম ‘৭৫-এর নভেম্বর বা ডিসেম্বরে প্রবোধদের বাড়িতে রাশিয়ান এসএমজি খুলে দেখার সময় মিসফায়ারে বাবুল হক এবং ফারুক আহমেদ আহত হয়েছিল। যা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক। বাবুল হকের হাতে, ফারুক আহমেদের পায়ে গুলি লেগে ওরা আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়। ফারুক অনেক যন্ত্রণা ভোগ করে গত বছর স্বগোত্রীয়দের হাতে নিহত হয়েছে। বাবুল হক কষ্ট নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। সেই বাবুল হকই পরশু এসেছিল। পাগল মানুষ, খুব একটা কিছু চায় না। কয়েক বছর আগে বলেছিল, মালেক ভাইয়ের ছেলে খেলন বাংলাদেশ টেলিভিশনের ডাইরেক্টর। তাকে বলে দিলে তার দুই শিফটে ডিউটি হতে পারে। তাতে মোটামুটি পেট চলবে। খেলনকে আগাগোড়াই ভালোবাসতাম, স্নেহ করতাম। বিয়ে করেছে ভোলার লালমোহনে। খেলনের শ্বশুরও ভালো মানুষ ছিলেন। বলেছিলাম, বাবুল হককে দেখ।

মনে হয় সে দেখার সময় পায়নি। গত পরশু তাকে বলেছি, চিরদিন কারও সম্মান নাহি যায়। এই বাবুল হক এবং অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহমেদ বালু মোক্তার এমপিকে নিয়ে ‘৭২-এ প্রথম দিলি্ল গিয়েছিলাম। তখন ঢাকা-দিলি্ল, দিলি্ল-ঢাকা বিমান ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। সঙ্গে ছিল ভারতের মহীয়সী নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর জন্য বঙ্গবন্ধুর চিঠি। সেবার কী যে সম্মান করেছিলেন বলে বুঝাতে পারব না। বিদায়ের সময় ইন্দিরাজী নিজে গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন। পরে যখন ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম পুত্রসম স্নেহ পেয়েছিলাম। কোনো কথা বলতে জড়তা ছিল না। তখন কতবার জিজ্ঞাসা করেছি, আপনি আমায় গাড়িতে তুলে দিতে গেলেন কেন? ইন্দিরাজী বলতেন- টাইগার, তুমি তোমাকে চিন না। ভারতে তুমি ভীষণ প্রিয়। অনেক সময় পার হয়ে এসেছি। অনেকের বিরোধিতা, অকল্যাণ কামনা যেমন পেয়েছি, তেমনি অফুরন্ত ভালোবাসাও পেয়েছি। ভারতের বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার কাছে আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নেই, একেবারে আপনজনের মতো আমরা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমার প্রিয় ভগ্নী, তার সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ পুঁজি করে অনেকেই লাভবান হন।

এই তো সেদিন ২৭ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও গিয়েছিলাম ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিহত আবু হানিফের পরিবারকে সামান্য আর্থিক সাহায্য করতে। আমাদের ঠাকুরগাঁও সার্কিট হাউসে কোনো জায়গা তো দেওয়া হয়ইনি, ব্যাংকে একটি স্থায়ী আমানত করে দেওয়ার জন্য সেখানে বসতে দিতেও এডিসি জেনারেলের আপত্তি ছিল। তাকে ডিসি পাঠিয়েছিলেন আমরা যাতে সার্কিট হাউসে বসতে না পারি। পরে গণ্যমান্যদের কাছে শুনে অবাক হয়েছি ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন নাকি জেলার মালিক ডিসিকে বলেছে, আমাকে জায়গা না দিলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুব খুশি হবেন। আমি না খেয়ে থাকলে, কোথাও অপঘাতে মারা গেলে, আমার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ভিক্ষার পাত্র নিয়ে রাস্তায় নামলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুশি হবেন- এমন কথা ভাবতেও যেন কেমন লাগে। কোনোক্রমেই কেন যেন মন সায় দেয় না। এখন যদি মন সায় না দেয় কী করে এসব ছোট কথা বিশ্বাস করি? নিজে তেমন বড় না হলেও বড় বড় মানুষের সঙ্গে কম ঘোরাফেরা করিনি। তাই মনটা খুব বড় বানাতে না পারলেও অত ছোট বানাই কী করে? সেদিন নাসিমের জানাজায় দোয়া দরুদ শেষে ছবিটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দিতে গেলে এসএসএফের লোকজন মনে হয় বাধা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঝটপট বলেছিলেন, আসতে দিন। ছবিটি তার হাতে দিলে আপনজনের মতো বলেছিলেন, ‘ও তোমরা যে পাটনায় গিয়েছিলে এ সেই ছবি। নাসিম সেখানে ছিল?’ ছিল বলেই তো ছবি।

জানি জীবন সরলরেখায় চলে না। অাঁকাবাঁকা পথ বেয়েই জীবন অগ্রসর হয়। উত্থান-পতনহীন জীবন অর্থহীন। রাজনৈতিক অমিল থাকলেই মানবিক গুণাগুণ বর্জন করতে হবে- এটা কেমন কথা? এই তো ক’দিন আগে ছোটবোন রেহানার সঙ্গে কথা হয়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেছিল, ভালোবাসা মমতায় বুক ভরে গিয়েছিল। তার প্রথম কথা ছিল, ভাই আপনার কলিজা কুশি কেমন আছে? কুশিকে আনলে ভালো করতেন। সারা জীবন মায়ের প্রতি দুর্বল ছিলাম। কেন যেন কুশিমনির প্রতি সেই দুর্বলতা দেহমনে বাসা বেঁধেছে। কুশিমনিকে অবহেলা করলে গা জ্বালা করে। আবার কেউ ওর খোঁজ করলে, মায়া করলে আপনা আপনিই বুক ভরে যায়। মায়ের পেটের ছোটবোনদের মতোই তার সঙ্গে কথা হয়। কারও আন্তরিকতা, সততা, ভালোবাসাকে অসম্মান করি কী করে?

রেহানা যখন বলে, বাবার মৃত্যুর পর আপনি প্রতিবাদ করেছেন শুনে আমরা হতাশার অন্ধকার সাগর থেকে উঠে এসেছিলাম। আমাদের চারদিকের গভীর অন্ধকারে আলোর দিশা পেয়েছিলাম। রেহানা আমাকে ‘কাদের ভাই’ বলে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কখনো কাদের বলেন না। সেদিন নঈম নিজামের এক লেখায় ভোলা থেকে সাগর লঞ্চে ফেরার পথে তখনকার বিরোধী দলের নেত্রী নাকি আমায় কাদের বলে ডেকেছিলেন। দাড়ি চুল পাকা থাকায় সাংবাদিকদের কাছে নাকি আমাকে বড়, নেত্রীকে ছোট মনে হয়েছিল। আসলে আমরা সমবয়সী। আমার জন্ম তারিখ লেখা ছিল না। তাই এখনো সঠিক বলতে পারি না। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর থেকে আমি ৬-৭ বছরের ছোট। মাঝে দুই ভাই-বোন ছিল। ওদিক থেকেই হিসাব করি। তবে আমাদের দুজনেরই জন্ম ‘৪৭ সালে। তিনি আমায় কাদের বলে ডাকেন না, তার শ্বশুরের নাম কাদের মিয়া তাই ‘বজ্র’ নামে ডাকেন। ‘বজ্র’ আমার প্রিয় নাম। ‘বজ্র’ নামে ডাকার এখন চার-পাঁচজন ছাড়া তেমন কেউ নেই। তাই তিনি যখন ‘বজ্র’ নামে ডাকেন ভীষণ ভালো লাগে। বিষয়টা বড়-ছোটর নয়।

মায়ের পর মায়ের মতো আদর স্নেহ ভালোবাসা, সেটা বোন শেখ হাসিনার কাছে পেয়েছি। তাই তাকে মায়ের মতোই দেখি। আলোচনা-সমালোচনা যা করি তার সবটুকুই তার কর্মকাণ্ডের। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মমতা, শ্রদ্ধা ছাড়া তার জন্য অন্য কিছু নেই। এখনো জয় মামা বলে উৎফুল্ল হয়। ববির গভীর নিষ্ঠা সৌজন্য দেখে বিমোহিত না হয়ে পারি না। আর রেহানা? তুলনাহীন। ওর মধ্যে মায়ের সব গুণ আছে। দুরবিন দিয়ে খুঁজেও কপটতা পাওয়া যাবে না, এমনটাই আমার বিশ্বাস। আল্লাহ রাসূলের প্রতি তার গভীর নিষ্ঠা কল্পনাতীত। কত কথা শুনেছি, দু’চার কথা নিজেও বলেছি। কিন্তু যখন বলেছে, মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, ছেলেকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। শুধু বলেছি, আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হলে বাবা তোমাকে মুসলমান হতে হবে। ছেলের বউকে মুসলমান বানিয়েছি। জয়ের স্ত্রীকে কালেমা পড়িয়েছি। তাই আমাকে কি একটু দয়া করে আল্লাহ বেহেশতে জায়গা দেবেন না? রাজনীতি করি বলে স্বার্থান্ধ হয়ে কাউকে ছোট করতে হবে? চোখ-কান বন্ধ করে গালমন্দ করতে হবে, ওসব করি কী করে? আল্লাহ সবই জানেন এবং দেখেন। আল্লাহর প্রতি আস্থাবান তার কোনো বান্দাকে তিনিই রক্ষা করবেন।

নাসিম ওসমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তার পরিবার-পরিজনদের স্বজন হারানোর শোক সইবার তাওফিক দিন।

লেখক : রাজনীতিক

About admin

Check Also

‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে’

গণফোরাম গঠনের সময় আমি ভোরের কাগজের রিপোর্টার। সৈয়দ বোরহান কবীর আর আমি ড. কামাল হোসেনের মতিঝিল অফিসে গেলাম। এরপর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের অফিসে। ব্যারিস্টার আমীর তখন মতিঝিলে বসেন। শুরুটাতে উত্তাপ ছিল। কারণ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, পংকজ ভট্টাচার্য, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকসহ ডান-বামের বিশাল রাজনৈতিক একটি গ্রুপ ছিলেন কামাল হোসেনের সঙ্গে। সেই সময় দেশজুড়ে তোলপাড়। সবার ধারণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *