Home | অপরাধ | মৃত্যুর সাড়ে চার বছর পর লাশ দাফনের নির্দেশ!

মৃত্যুর সাড়ে চার বছর পর লাশ দাফনের নির্দেশ!

আইনি জটিলতায় চার বছরের অধিক সময় ধরে হিমঘড়ে থাকা ধর্মান্তরিত নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের লালার খামার এলাকার হোসনে আরা লাইজুর (লিপা রানী) মরদেহ ইসলামী ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ের কপি পাওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে মরদেহ দাফন করতে হবে। নীলফামারীর জেলা প্রশাসককে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে দাফন কাজ সম্পন্ন করতে হবে। দাফনের আগে হোসনে আরা লাইজু (লিপা রানীর) লাশ তার বাবার পরিবারকে দেখার সুযোগ দিতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার বামুনিয়া ইউনিয়নের অক্ষয় কুমার রায়ের মেয়ে লিপা রানী রায়। তার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ুন কবির লাজুর প্রেম ছিল। তারা ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। ধর্মান্তরিত হবার পর লিপার নতুন নাম হয় হোসনে আরা লাইজু। সুখেই কাটছিল তাদের দিন। কিন্তু বাধঁসাধে লিপার পরিবার। বিয়ের পর মেয়ের বাবা ডোমার থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ছেলের বাড়ি থেকে মেয়েকে উদ্ধার করে আদালতে প্রেরণ করে।

লিপাকে তার বাবা নাবালিকা দাবি করায় আদালত তাকে রাজশাহীস্থ সেভ কাষ্টরিতে রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। পরবতীর্তে মামলার ধার্য তারিখে মেয়েটিকে আদালতে নিয়ে আসে। আদালত জামিন মঞ্জুর করে বাদী পক্ষের নিকট রাখার আদেশ দেন। একইদিন ছেলের পরিবারও মামলার ধার্যের দিন ট্রেন যোগে রাজশাহী থেকে ফেরার পথে দিনাজপুর জেলার বিরামপুর স্টেশনে হুমায়ুন কবির লাজু হটাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাকে বিরামপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। হাসপাতালে নেয়ার পথেই সে মারা যায়।

৫৪ দিন পর হোসনে আরা লাইজু (লিপা রানী) পরিবার তাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার প্রস্ততি নিলে সে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার আগে লিপা তার স্বামীর কবরের পাশে কবর দেয়ার জন্য চিরকুট লিখে যায়।

লিপা রানীর মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেয়া হয়। সেখানে ময়না তদন্তের পর ২০১৪ সালের ১০ মার্চ থেকে মরদেহটি হিমঘরে পড়ে আছে। মরদেহটি নিজের মেয়ের বলে দাবি সনাতন ধর্মমতে সৎকার করার আবেদন করেন হিন্দু বাবা অক্ষয় কমার রায়, আর পুত্রবধূ হিসেবে দাবি করে তাকে মুসলমান রীতিতে দাফনের আবেদন জানান মুসলমান শ্বশুর জহুরুল হক।

ভালবেসে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করার কারণে মরদেহ নিয়ে এমন আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন ছেলে ও মেয়ের পরিবার। মেয়ের বাবা অক্ষয় কুমার নীলফামারী সদর কোর্টে মেয়ের মরদেহ চেয়ে মামলা করেন। কিন্তু মামলার রায়ে অক্ষয় কুমার হেরে যান। পরে তিনি সাব জজ আদালতে আপিল করেন। সেখানে ছেলের বাবা জহুরুল ইসলাম হেরে যান। এর পর ছেলের বাবা হাইকোর্টে আপিল করেন।

লাশের দু’জন দাবিদার হওয়ায় সেখানেও সৃষ্টি হয় আইনি জটিলতা। মামলাটি বিচারিক আদালত ঘুরে হাইকোর্টে আসে। রংপুর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে মরদেহ হস্তান্তর করতে পারেনি।

গত বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) হোসনে আরার লাইজু (লিপা রানী) মরদেহ ইসলামি ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করার নির্দেশনা দেয় উচ্চ আদালত। আদালতে মেয়ের বাবার পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট সমীর মজুমদার। ছেলের বাবার পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট এ কে এম বদরুদ্দোজা।

লাজুর বাবা জহুরুল ইসলাম পুত্রবধূর মরদেহ দাফনের অনুমতি পেয়ে হাইকোর্টের এ রায়ে জানান, তার ছেলে ভালোবেসে নীলফামারী আদালতে এফিডেভিট করে নিপাকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ছেলে-মেয়ে দুজনই মারা গেছে। আমার ছেলে এক সাথে থাকতে না পেরে পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে অন্তত তাকে আমার ছেলের কবরের পাশে দাফন করে তাদের এক করে দিতে পারবো। এতেই আমার শান্তি।

About admin

Check Also

রং নাম্বারের এক ফোনে প্রেম-ধর্ষণ; বদলে দিল পুরো জীবন!

মোবাইলে রং নাম্বারের এক ফোনে কথিত সম্পর্কের পরিণতি প্রেম-ধর্ষণ। বদলে দিয়েছে এক তরুণীর জীবন। এমন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *